চলতে হয় চলছি, বলতে হয় বলছি । সমা খান | আলোকিত প্রতিদিন

চলতে হয় চলছি, বলতে হয় বলছি । সমা খান

Spread the love

চলতে হয় চলছি, বলতে হয় বলছি

সমা খান

(পর্ব-১০)

    সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে কিছু বলা এবং কিছু লেখা এটা কিন্তু আসলে সব সময়ের চাহিদা l যেমন আজকের চিন্তা আগামীকাল পাল্টে যেতে পারে আজকের লেখা আগামীকাল গুরুত্বহীন হয়ে পরতে পারে l সময়ের সাথে প্রবাহমান যাত্রার নামেই জীবন l সময় হচ্ছে এমন এক যাযাবর যে তাকে ধরে বেঁধে রাখার কোনো উপায় নেই l সময় সহসাই রং পাল্টায় গুরুত্ব আর গুরুত্বহীন এর পার্থক্যও সহজবোধ্য করে তোলে l  ফলে অধিকাংশ সময়ের কার্যক্রম অতিক্রম করলে আর সঠিক মনে হয় না l আমরা যারা আমাদের নিত্যদিনের যাপিত জীবনের দিকে একটু সচেতনভাবে খেয়াল করি তাহলে দেখা যায় আমরা সুখী মানুষের কাতারে দাঁড়াতে পারি না l প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে খবরের পর খবর, অনিয়ম, উশৃংখলতা আর অস্থিরতার কারণে একটা দুর্ঘটনার বিচার কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতীয়মান হবার আগেই আরো একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনার কবলে পতিত হতে হয় জাতিকেl যে কারণে সুখের পাশাপাশি শোকের আয়ু ভীষণভাবে কমে যাচ্ছে l চারদিকে রোগ-শোক, জরা, দুঃখ-গ্লানি পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছেl সেখানে শোকের মাতম শোনার সময় কোথায় মানুষের!  মানুষগুলো যখন দানবে পরিণত হয় তখন সামাজিক অবক্ষয় নৈতিক মূল্যবোধ তেপান্তরে পাড়ি জমায় l  আমি বলছি না বর্তমান সময়ে আমরা সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছি l  সময় আসলে অসময় কিংবা সুসময় বলে কিছু নেই l  আমার মনে হয়- সময় সবসময় সুসময় যেটা বিজ্ঞ এবং প্রাজ্ঞজনরা মনে করেন l আসলে সময় সুসময় না অসময় কীভাবে পার করছি সেটা নির্ভর করছে আমাদের নিজ নিজ কর্মের উপরে l অতীতে খারাপ সময় ছিলো বর্তমানেও আছে ভবিষ্যতেও থাকবে l  কিন্তু যারা এই  সময়কে  তার কাজের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেন অর্থাৎ সমাজ যাদের নীতিনির্ধারণের উপরে নির্ভর করে, তারা আসলে তাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পারছেন সেটাই বড় প্রশ্ন ? কখনো কখনো মনে হয় আমরা বোধহয় খুব বেশি বলতে পছন্দ করি, বাস্তবতা তার ভিন্ন অর্থাৎ আমরা যা বলি কার্যত তা করছি না l  ফলে আমাদের জীবনে এতো গরমিল এতো বৈষম্য l সবকিছু মিলিয়ে কখনো কখনো মনে হয় হাহাকার আর শূন্যতায় বিপর্যস্ত মানবতার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে মানুষকে বোধ হয় গত শতাব্দীর তুলনায় এই শতাব্দীতে অনেক বেশি  শোক বহন করে চলতে হচ্ছে l  এর থেকে পরিত্রাণের উপায় আমাদেরকে খুঁজে বের করতেই হবে l এটার মূল কারণ যদি আমরা না বের করতে পারি উত্তরন তো সম্ভবই না বরং স্বাধীন জাতি হিসেবেও এক ধরনের পরাধীনতার শৃংখলে নিজেরা বন্দিত্ব গ্রহণ করছি l   এটা জাতির জন্য শুভ লক্ষণ নয় l  পৃথিবীতে যুগে যুগে আমার মনে হয় নিয়ম আর অনিয়মের যে যুদ্ধনীতি দুর্নীতির যে পার্থক্য এটা খুব বেশি মানুষের পক্ষে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি l  পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষের জন্ম হয় কিছু মানবিক মানুষের কর্মের সুফল ভোগ করবার জন্য l  আর সেই মানবিক আত্মাগুলো আজীবন ধরে অন্যের কষ্ট বহন করে চলে l  এটা তাদের নিয়তি, এটা তারা মেনে নিয়ে জীবনকে যাপন করে l  কিন্তু পরিমিতি বলে একটা শব্দ আছে, সেটা বোধ হয় আমরা ভুলে যেতে বসেছি l সেখান থেকে আমার মনে হয় প্রত্যেককে একটু সচেতন হওয়া দরকার l  যার যার দায়িত্ব কর্তব্য যেখান থেকে যতটুকু পালন করা সম্ভব করা উচিত l  না হলে আমরা সামনের দিকে এগোতে পারবো না l

সেজন্যেই মোটা দাগে বলতে হয়- সুখী মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়, অনেক l আমরা যারা নগণ্য সংখ্যক মানুষ অনেকটা জন্মগতভাবেই অন্যের কষ্ট বহন করে চলি  কিংবা চলতে হয়  তাদের আসলে  নিজের কষ্টকে  কষ্টই মনে হয় না l সেটা মনে হয় জীবনের বাস্তবতা অন্যের কষ্ট দুঃখ দুর্দশা সারা পৃথিবীব্যাপী এতো বেশি যে নিজের দিকে খুব ভালো করে তাকাবার সময়টা কখন ! আমার মতো বা আমাদের মতো কিছু সংখ্যক অসহায় মানুষদের কথা ভেবে খুব কষ্ট পাই মনে l  ছোট্ট একটা জীবন কতো কিছু করতে চায় মানুষের জন্য l মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে নিজের কিছুটা হলেও অবদান রাখার জন্য l  কিন্তু পারছি কি পারছি না, মাঝেমধ্যে অবাক লাগে- আমার বয়স খুব বেশি না এইটুকু সময়ের মধ্যে আমি যে পরিবর্তন যে বৈষম্য মানুষ সে মানুষ সে সমাজে রাষ্ট্রে এমনকি সমগ্র বিশ্বে দেখলাম তাতে করে আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে আমাদের পূর্বে যারা পৃথিবীতে এসেছিলেন তারা আসলে কীভাবে সময়টাকে পার করেছেন? তারা কীভাবে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে তাদের ধৈর্য্য সহ্য ক্ষমতা কতটুকু ছিলো? তারাই তো আমাদেরকে একটু একটু করে আধুনিকতার দ্বার উন্মোচন  করেছেন l আধুনিকতা ও তার বাস্তবায়ন দেখার কিছুটা হলেও সুযোগ করে দিয়েছেন l সুতরাং সেদিক থেকে তো অভাগা নই সৌভাগ্যবানই বলা যায় নিজেকে l তবুও পূর্বপুরুষের কষ্টের কথা ভাবি তাদের লেখা পড়ি তাদের অনুভূতির কথাগুলো জানতে পারি নানান দিক থেকে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সবকিছুর মধ্য থেকেই যেটুকু বুঝি তাতে মনে হয় পৃথিবীর মানবিক আত্মাগুলো সুখে থাকতে পছন্দ করেন না l তারা স্বার্থপর হতে পারেন না তারা অন্যের অনুভূতিকে অন্যের চাওয়াকে অন্যের  অপ্রাপ্তিকে ভেতরে লালন করেন পালন করেন ধারণ করেন l সকল মানুষের  অপ্রাপ্তি এবং ন্যায় সঙ্গত যুক্তিসঙ্গত চাওয়াগুলোকে পাওয়ায় পরিণত করবার লক্ষ্যে প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকেন নিরবে কাজ করেন l  সেজন্যই বোধহয় এখনো মানব সভ্যতা ধ্বংসের শেষ জায়গায় যে পৌঁছায়নি l সুতরাং মাঝেমধ্যে হতাশা এবং নৈরাশ্য আঁকড়ে ধরলেও আশাবাদী হয়ে বেঁচে থাকি আগামী প্রজন্মের সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় l এখানে আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য কী সেগুলোকে যদি আমরা সঠিকভাবে নিরূপণ করে কাজ করতে পারি তাহলে এখনো সভ্য পৃথিবী গড়ার জন্য অনেক কিছু করবার আছে আমাদের l সমস্যা হলো আমরা সংঘবদ্ধ হতে পারছি না, আমি আমরা হতে পারছি না , আমরা আমাদের হতে পারছি না l যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমরা হতে না পারবো, আমরা আমাদের হতে না পারবো ততক্ষণ পর্যন্ত হতাশা নৈরাজ্য অস্থিতিশীল সমাজ ধর্ম বর্ণের ধনী গরিবের বৈষম্যের ভিত্তিতে গড়া তথাকথিত আধুনিক  সভ্য পৃথিবীর মিছে গুঞ্জন বন্ধ হবে না l আমার মনে পড়ছে কিছুদিন আগে আমার একটি লেখায় লিখেছিলাম সুদান সোমালিয়া ফিলিস্তিনি এককথায় পৃথিবীর নিপীড়িত বঞ্চিত শোষিত মানুষদের ক্ষুধা দারিদ্রের দুর্ভিক্ষের চিত্র আমাকে এতোটাই দুর্বল করে রেখেছে যে আমি সেই লেখায় লিখেছিলাম বিল গেটস কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য ধনকুবেরদের দিকে তাকিয়ে থেকে আমার কী লাভ?  পৃথিবীর সকল আধুনিকতাকে পাশ কাটিয়ে আমি কেবল ওই চিত্র ওই দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি চাই, ওই শোষণ-নিপীড়ন ওই বঞ্চিতের বৈষম্য দূরীকরণ চাই l  সুতরাং আমাকে বলতে বাধ্য করেছে এই পৃথিবী “প্রত্যহ শতকোটি আত্মাকে অভুক্ত রেখে সভ্য পৃথিবীর মিছে গুঞ্জন ও অসভ্যতার ধ্বংসাবশেষ নয় কি ?” অবশ্যই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ এর উপর আমরা দাঁড়িয়ে এখান থেকে আমাদেরকে ফিরে আসতেই হবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে l  ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা, রাহুল এরা প্রতিদিন জন্মাবে না। কিউবা বিপ্লব পৃথিবীর শেষ বিপ্লব না। আমাদেরকে  তাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলোকে সমাপ্ত করতে হবে l তা না হলে আমাদেরকে তারা ক্ষমা করবে না l তাদের কতো সীমাবদ্ধতা ছিলো তারপরেও আমাদের কাজ কতো সহজ করে দিয়ে গেছে আমরা কেন পারছি না শেষটুকু করতে?  তবে তো বলতেই হয়- আমরা খুব বেশি স্বার্থপর ! আশাবাদী মানুষ হিসেবে আমি শেষ কথা কেবল এটাই বলব আজও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লবের অপেক্ষায় আছি এবং সেই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের হাতটি যেন হয় আমার এবং আমাদের l

আলোকিত প্রতিদিন/১১ জুলাই’১৯/জেডএন
এই সংবাদ ১৬৯ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন