গভীর অন্ধকারে বাংলাদেশ জুটমিল্স করপোরেশন এর উত্তোরণ কোথায় | আলোকিত প্রতিদিন

গভীর অন্ধকারে বাংলাদেশ জুটমিল্স করপোরেশন এর উত্তোরণ কোথায়

Spread the love

গোলাম রব্বানী টুপুল: প্রাচীন কাল থেকেই উপমহাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাটের ব্যবহার হয়ে আসছে। পাট একটি অর্থকারী ফসল। বাসস্থান থেকে শুরু করে ভাতের থালা পর্যন্ত পাটের জয় জয়কার। সংস্কৃত শব্দ ‘পট্ট’ থেকে ‘পাট’ শব্দের উৎপত্তি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় দুই হাজার বছর আগে যীশু খৃষ্টকে ত্রুসে চড়ানো হয় তখন তাঁকে পাটের তৈরি চট পরিয়ে নেয়া হয়েছিল। এথেকে সহজেই বোঝা যায়, পাট অতি আদিকাল থেকেই বিশ্বে সমাদৃত।

পাটের ব্যবহার অতি আদিকাল থেকে প্রচলিত থাকলেও মূলত বৃটিশদের হাতেই বহুমূখী ব্যবহারের প্রচলন ঘটে। তাদের হাত ধরেই পাট একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়। ইংল্যান্ডের ডাণ্ডি শহরটি গড়ে ওঠে এদেশীয় পাটকে কেন্দ্র করে। বৃটিশ ভারত স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের ভূ-খণ্ডটি পাকিস্তান অংশে যুক্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান অর্থকারী ফসল পাটকে ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়তে থাকে। পাশাপাশি পাটশিল্প পূর্বপাকিস্তান কেন্দ্রিক শিল্প প্রতিষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ ও তাদের আধিপত্যকে এদেশের মানুষ মেনে নিতে না পারায় স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে তোলে।

পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং দেশ স্বাধীন হয়। পাট শিল্প স্বাধীনতার আন্দোলনে আগুনে ঘি ঢালার মত কাজটি করেছে। স্বাধীনতার পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে একটি অধ্যাদেশের মধ্যদিয়ে জুটমিল গুলোকে সরকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মীকরণ করা হয়। পরবর্তীতে সংবিধানের মাধ্যমে আইন সম্মত ভাবে একটি পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ‘‘বাংলাদেশ জুট মিল্স করপোরেশন’’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানতম করপোরেশনটি স্বদর্ভে চলতে থাকে। এতো বড় সম্পদশালী করপোরেশন বাংলাদেশে আর আছে বলে জানা নেই। ৭৭টি জুট মিলকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শুরু হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর পর থেকে অনাদর আর অবহেলায় প্রতিষ্ঠানটি দিনের পর দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে।

জানলে অবাক হবেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে আমাদের মোট জনসংখ্যা ২২% লোক পাটশিল্পের সাথে জড়িত। পাট উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্যকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয়ার কাজ প্রায় ৪ কোটি লোকের জীবন জীবিকার অংশ হয়ে আছে এই পাট শিল্প। বর্তমানে ২৭টি জুটমিল নিয়ে খুঁড়িয়ে খঁড়িয়ে হাঁটছে বিজেএমসি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে বিজেএমসি’কে জিইয়ে রেখেছেন। ‘ম্যাণ্ডেটোরি প্যাকেজিং এ্যাক্ট ২০১০’ আইন পাশ করণসহ অর্থসহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চালিয়ে রাখার নানামূখী প্রচেষ্টা চালু রেখেছেন। ইতিমধ্যে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে পাটের বহুমূখী ব্যবহারের অংশ হিসেবে পাট থেকে পলিথিন তৈরির প্রকল্প ও পাট পাতার ভেষজ পানীয় উৎপাদন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এতোকিছুর পরও বিজেএমসি ভালো নেই। চোখে তার ঘোর অমানিশা। এনিয়ে ভাবতে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলাম লতিফ বাওয়ানী জুট মিল্স এর শ্রমিক নেতা জনাব মোহাম্মদ আলী সাহেবের সামনে। তার বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে ৩৫টি মিলকে বেসরকারী করণ করেছিল মিলগুলোকে চালিয়ে রাখার শর্তে। অথচ লিজ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান শর্ত ভঙ্গ করে তারা মিলগুলোতে একটি যন্ত্রাংশও অবশিষ্ট রাখেনি। উপরন্তু তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। ফলে ঐসকল মিলগুলো সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ হয়ে যায়। যে মিলগুলো চালু রয়েছে সেগুলোকেও একটি মহল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে কোণঠাসা করে রেখেছে। বেসরকারী করণের পথ দেখাচ্ছে সরকারকে। আশা করি সরকার সেই ফাঁদে পা দিয়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মচারীর পেটে লাথি দেবে না। ‘ম্যাণ্ডেটোরি প্যাকেজিং এ্যাক্ট ২০১০’ বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে এলে ৫০% পন্য দেশীয় বাজারে কনজিউম করার লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ হবে না। এজন্য সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিজেএমসি কে অবশ্যই সময়মত পাট ক্রয় করতে হবে এবং নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের পর শ্রমিকেরা ওয়েজেজ পাবে কিনা তা নিয়ে শংকায় আছি। সামনে নির্বাচন। নতুন যে সরকার আসবে তাদের প্রতি আমার আগাম আহ্বান, তারা যেনো পাট শিল্প তথা বিজেএমসি’র প্রতি সু-দৃষ্টি দেন।’

শ্রমিক নেতার এই বক্তব্যে এক রকম হতাশার সুর যেন বাজছে। তবে কী বিজেএমসি’র সামনে ঘোর অমানিশা? সরকারের আরো করপোরেশন রয়েছে যারা নিয়মিত ভাবে লসের কোটায়। এক্ষেত্রে বিজেএমসি অতোটা মন্দের মধ্যে নেই। কেন না, বিজেএমসি’র সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ তাদের রয়েছে একটি সু-বিশাল ক্রীড়া সংস্থা। যার ব্যয়ভার সম্পূর্ণ বিজেএমসি বহন করে। সরকারী মজুরী কমিশনের কারনে স্বাভাবিক ভাবেই বেসরকারী মিল থেকে বিজেএমসি’র উৎপাদন ব্যয় বেশি। সময় মত পাট ক্রয় এবং বিপনন বিভাগ শক্তিশালী হলে বিজেএমসি ঘুরে দাঁড়াবে বলে বিশ্বাস করি।

আলোকিত প্রতিদিন/০৪ ডিসেম্বর/আরএ

এই সংবাদ ৩৫১ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন