চিকিৎসাসেবায় পর্যটন ও বাংলাদেশ । শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন | আলোকিত প্রতিদিন

চিকিৎসাসেবায় পর্যটন ও বাংলাদেশ । শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন

Spread the love

সাড়া বিশ্বে এখন পর্যটনের জয়জয়কার। বিগত কয়েক দশক ধরে তাবত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল অর্জনকারী খাতে পরিণত হয়েছে পর্যটনশিল্প। এ শিল্পের মধ্য দিয়ে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, তেমনি যোগ হচ্ছে লক্ষ কোটি কর্মসংস্থানও। প্রতি ১১ জন কর্মজীবী মানুষের একজন ওতপ্রোত ভাবে পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত। বর্তমান সময়ে এবং আগামি দুই/তিন দশক এই সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের নেতৃত্ব দিবে উদীয়মান এশিয়া। এশিয়া অঞ্চলে পর্যটক আগমন যেমন দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি পর্যটক গমনেও। এর পাশাপাশি চিকিৎসা পর্যটনেও বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে মধ্য এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো।

ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্যুরিষ্ট পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে শুধু মাত্র তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের একঘেমী দূর করে অবসর সময়টা নিজের মত করে আরাম আয়েশ বা চিত্তবিনোদনের জন্য সব সময় ব্যাপারটা এইরকম নাও হতে পারে। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ঘুরাঘুরি বা চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্য বা চিকিৎসা উদ্দেশ্যে একদেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করে থাকেন তাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। একটা সময় ছিল বাংলাদেশ থেকে কেবল মাত্র হাতে গোনা কিছু বিত্তশালী লোকজন ভাল চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, আমেরিকা বা কিউবায় যেতেন কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের আয় বাড়ার সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ লোক ভাল ও উন্নত চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, থাইল্যান্ড, বা মালয়শিয়ার মত দেশগুলোতে অহরহ পাড়ি জমাচ্ছেন। আমাদের দেশের চিকিৎসকদের মান খারাপ বা লোকজনের কাছে টাকা আছে বলে যে সবাই এই সকল দেশে চিকিৎসা করাতে যাচ্ছেন তাও বলা যাবে না, এর প্রধান ও একমাত্র অন্তরায় হচ্ছে আমাদের ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থা। আর এতে করে আমাদের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত বছর আমাদের দেশ থেকে দেশের বাইরে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ঘুরতে গেছেন তাদের সংখ্যাটা ছিল প্রায় ২২/২৩ লক্ষ যার বড় একটা অংশ ভারতে গেছে শুধুমাত্র তাদের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে (সুত্রঃ statista.com) এবং এই সময় বাংলাদেশে আসছে সর্বসাকুল্যে ৫/৬ লক্ষ পর্যটক যা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এতোটাই নাজুক যে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রতি ৩০১২ জন রোগির জন্য আছেন একজন চিকিৎসক আর প্রতি ২৬২৫ জন রোগির জন্য একজন নার্স বা সেবিকা। এটা শুধু আমাদের চিকিৎসা সেবার দৈন্যদশা না, এইটা আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা অবহেলিত তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অথচ আমরা সব সময় আমাদেরকে অতিথি পরায়ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জাতি হিসাবে স্বীকৃতি দিতে ভালবাসি তার যদি ছিটেফোটাও চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেখাতে পারতাম তাহলে বাংলাদেশ হত চিকিৎসা সেবায় বিশ্বে অন্যতম গন্তব্য স্থান এবং ভারতকে দিতে হত না লক্ষ কোটি ডলার।

মজার বিষয় হচ্ছে, ভারতে একজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে তার পড়াশুনা শেষ করে ডাক্তার হতে খরচ পরে সরকারী মেডিকেল কলেজ গুলোতে ১৫-২০ লক্ষ টাকা আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রায় ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত, শুধু ভারত নয় পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে এইরকম বা আরো বেশি খরচ হয় একজন ডাক্তার তৈরি করতে। সেখানে বাংলাদেশের একজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে সর্বসাকুল্যে সরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতে ১/২ লক্ষ টাকা এবং প্রাইভেটে ১০-১৫ লক্ষ টাকা লাগে যার দরুন অনেক ভারতীয় ও অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরাও বাংলাদেশে সরকারী বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি হয়ে ডাক্তারি পাস করেন। অথচ এতো অল্প খরচে ডাক্তার তৈরি করেও আমরা ভারতের থেকে কম খরচে আমাদের জনগোষ্ঠিকে চিকিৎসা সেবা দিতে পারছি না সেট অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।

কিউবা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডের মত দেশগুলো এখন ফাইভ স্টার মেডিকেল রিসোর্ট তৈরি করেছে তাদের বিদেশি পর্যটকদের সময় নিয়ে উন্নত মানের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য যা বর্তমান বিশ্বে পর্যটন খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আমাদের এখনই এই বিলাসিতা করার সুযোগ না থাকলেও সময় এসেছে পর্যটনের অন্যান্য দিকগুলোর মত করে চিকিৎসা সেবায় পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়ার।

প্রতিটি গন্তব্য স্থান বা পর্যটন স্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটে থাকে আর যদি হয় সেটা চিকিৎসা সেবার কেন্দ্র করে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। পর্যটন নিয়ে যারা নুন্যতম খোঁজ খবর রাখেন তাদের কাছে সহজে অনুধাবন যোগ্য, একজন আরোগ্য প্রার্থী যখন একদেশ থেকে আরেক দেশে যান সে কখনোই একা মুভ করেন না সাথে এক বা একাধিক লোক সাথে নিয়ে যান, তাদের থাকা খাওয়ার জন্য যেমন চিকিৎসা কেন্দ্র/পর্যটন কেন্দ্র কেন্দ্রিক হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠে তেমনি শপিংমল (অন্যদেশে চিকিৎসা বা ঘুরতে গেছেন তাই বলে কি নিজের বা পরিবারের জন্য স্মারক বা সৌখিন দ্রব্যাদি শপিং করবেন না তা কি করে হয়), মানি এক্সচেঞ্জ, পরিবহন ব্যবসাসহ সব ধরনের ব্যবসা বানিজ্যই গড়ে উঠে।

যতদিন যাচ্ছে ততই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিকিৎসা পর্যটনেও গুরুত্ব বাড়ছে এশিয়া অঞ্চলের। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা কিউবা ও ইউরোপের দেশগুলোতে সর্বাধুনিক মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। যার দরুন উন্নয়নশীল দেশগুলোর রোগীদের পাশাপাশি অনেক উন্নত দেশের মধ্যবিত্ত রোগীরাও চিকিৎসার জন্য এশিয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাশ্রয়ী এবং মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা দিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী টানছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভারত। ২০১৫ সালে এ তিনটি দেশ মিলে এশিয়ার ৮৫ শতাংশ চিকিৎসা পর্যটক টেনেছে। তবে চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয়ের দিক থেকে এশিয়ায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারত এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাইল্যান্ড। এশিয়ান মেডিক্যাল ট্যুরিজমের দেওয়া ‘এশিয়া মেডিক্যাল ট্যুরিজম অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ফরকাস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, রোগী আগমন ও সাশ্রয়ী ব্যয় বিবেচনায় চিকিৎসা পর্যটনে এশিয়ার শীর্ষ পাঁচটি দেশ হচ্ছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত।

আগামি দুই-তিন দশক যে দক্ষিন এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রচুর পরিমান বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটবে সেটা সর্বশেষ আইটিবির ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল ট্রেন্ডস’ প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান দেখলে কিছুটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায়, ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল মনিটরের তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে গত কয়েক বছরে চালিকাশক্তির ভূমিকায় এসেছে এশিয়া। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এশিয়া থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটন ভ্রমণ বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। ‘ট্যুরিজম টুওয়ার্ডস ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন হয় রেকর্ড এক হাজার ২৬৭ মিলিয়ন। প্রবৃদ্ধি আসে ৬ শতাংশ। এতে এগিয়ে রয়েছে উদীয়মান এশিয়া এবং এ অঞ্চলে পর্যটক আসে ২৮০ মিলিয়নের উপরে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় পর্যটনের জন্য আগামি দশক হবে এশিয়ার। কিন্তু বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত দক্ষিন এশিয়ায় চিকিৎসা ক্ষেত্র সহ অন্যান্য উদ্দেশ্যে আগত পর্যটকদের পর্যাপ্ত আতিথেয়তা দিতে??

লেখক: শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন,
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ, ঢা.বি।

এই সংবাদ ৬০৪ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন