বায়ু দূষন মানব দেহে প্রতিক্রিয়া | আলোকিত প্রতিদিন

বায়ু দূষন মানব দেহে প্রতিক্রিয়া

Spread the love

মো: হাসিবুর রহমান:  প্রতি বছরই শীতকালে ঢাকা শহরে বায়ু দূষনের মাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়। সাধারনত: আমাদের দেশে শীতকালে বৃষ্টির পরিমান কম হয়, মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয় না। তাই অনাবৃষ্টিতে বাতাসে ধূলা-ধূয়া অর্থাৎ ভাসমান বস্তুকণা (suspended particles matters-smp) অতিমাত্রায় থাকাতে পরিবেশ দূষণ হয়। ফলে মানব দেহে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আজ বিশ্বব্যাপী পরিবেশ-পতিবেশের ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) সমগ্র মানব জাতি জন্য এক অশনি সংকেত এবং অন্যান্য জীববৈচিত্রের অস্তিত্ব রক্ষার হুমকী স্বরূপ। সারা বিশ্বে দেখা যাচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত তুষারপাত, জলচ্ছাস, সুনামি, বন্যা, ভূমিকম্প, অনাকাক্সিক্ষত খরা ও অতিবৃষ্টি ইত্যাদি। বিশ্ব উষ্ণায়নের অন্যতম উপাদান হচ্ছে বায়ু দূষণ। আর এই বায়ু দূষণের ফলে সৃস্টি হচ্ছে সমগ্র মানব জাতির স্বাস্থ্য সমস্যা। পাকিস্তান, আফগানস্তান, ইরান, সৌদিআরব, ভারতের দিল্লী-মুম্বাই, চীনের সাংহাই-পিকিংসহ অনেক দেশে বায়ু দূষণের পরিমান মাত্রারিক্ত। সেইসাথে ঢাকা শহরের বায়ু দূষনের মাত্রা মানব দেহের জন্য দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। আমাদের দেশে বায়ু দূষণের প্রধান কারনগুলি হচ্ছে- ত্রুটি যানবাহন, শিল্পকারখানার থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ইটের ভাটা থেকে অতিমাত্রার নির্গত কালো ধূয়া, ভাসমান বস্তুকণা ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস সমূহ প্রকৃতি ও মানব দেহের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরুপ।

বায়ু দূষণ মুলত: দুই ভাবে হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট। প্রকৃতির বিরূপ প্রবাহ এবং মানব সৃষ্ট অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমনের ফলে ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে বায়ু দূষণ হয়ে থাকে। সাধারনত: বিশুদ্ধ বাতাসে ৭৮.০৯% নাইট্রোজেন, ২০.৯৪% অক্সিজেন ও অবশিষ্ট ০.৯৭% বিভিন্ন গ্যাসের মিশ্রণ (কার্বন-ডাই-অক্সাইড, হিলিয়াম, আর্গন, নাইট্রাস অক্সাইড ও জেনন) এবং খুবই নগণ্য পরিমান জৈব ও অজৈব গ্যাস থাকে। উপরোক্ত পরিমানের তারতম্য ঘটলেই বায়ু দূষিত হয়েছে বলা হয়। প্রাকৃতিকভাবে বায়ু দূষণের কারণগুলির মধ্যে আগ্নেয়গিরির দাবানল, ধূলিঝড়, ফুলের রেণু, কুয়াশা ইত্যাদি। অপরদিকে মানব সৃষ্ট বায়ু দূষণের কারণগুলি হচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা, ইটের ভাটা ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সীসা (Lead) যুক্ত ধোঁয়া (লেডসালফার-ডাই-অক্সাইড), নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন, ওজোন গ্যাসসমূহ, এছাড়াও ইটের ভাটা কতৃক নির্গত ছাই, ভাসমান ব¯ু‘কণা বায়ু দূষণের প্রধান উৎস। মানব সৃষ্ট বায়ু দূষণে নির্গত গ্রীণ হাউস গ্যাসের (Greenhouse gases) প্রভাবে পৃথিবীর বায়ু মন্ডলের তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেখা দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে আজ সমগ্র বিশ্বের মানব জাতি শঙ্কিত। বায়ু মন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে সমুদ্র পৃষ্ঠের পানির উচ্চতা এক মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের মানুষের ভোগ-বিলাসী জীবন যাত্রার ফলশ্রুতিতে অতিমাত্রায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের ব্যবহারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্তিত করছে। কিন্তু তার বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের মতো নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবনে দারুণ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ার সাথে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনো-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড, সীসাযুক্ত ধোঁয়া (লেডসালফার-ডাই-অক্সাইড), মিথেন, নিকেলযুক্ত গ্যাসসমূহ দিন দিন নির্মল বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। ঢাকা শহরের ভিতরে ও চারিপাশে গড়ে ওঠা টেক্সটাইল, ট্যানারি, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, কেমিক্যাল, কীটনাশক, প্লাষ্টিক, পেপার এন্ড পাল্প, সার, সিমেন্ট, ডিস্টিলারি ইত্যাদি শিল্প-কারখানা বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস। যানবাহনে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানীর মধ্যে রয়েছে টেট্রা-ইথাইল-লেড যা জ্বালানী শক্তি উৎপাদনের দহন প্রক্রিয়া বাড়ানোর প্রধান উপাদান। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের ইঞ্জিনের অদগ্ধ জ্বালানির সাথে নির্গত ধোঁয়ার সাথে সীসাযুক্ত ধোঁয়া নির্গত হয়। এই সীসাযুক্ত ধোঁয়ার প্রভাবে মানুষের চোখ জ্বালাপোঁড়া করে, বমিবমি ভাব হয়, মাথা ধরে ও শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে। এছাড়া লেড এর বিষক্ত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে এবং হিমোগ্লোবিনের সাথে বিক্রিয়ার মাধ্যমে মানব দেহে অক্সিজেন প্রবেশে বাধা দেয়। ফলে মানব দেহে রক্ত তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটায়, এতে করে দেহে রক্তশুন্যতা (হিমোলাইসিস) দেখা দিতে পারে। তাছাড়া লেড রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে লিভার, কিডনি, দাঁত, হাড় এমনকি ব্রেইনেও অস্বাভাবিক খিচুনি (কনভালশন), ব্রেইন ডেমেজ পরবর্তীতে মৃত্যু মুখে ধাবিত হয়। কালো ধোঁয়া ও বাতাসে লেড এর পরিমান বৃদ্ধির প্রভাবে শিশুদের বমিবমি ভাব, হজম শক্তির ব্যাঘাত, শ্বাসকষ্টসহ মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে থাকে। শিশুদের মানসিক ভারসাম্যের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে ও ক্যান্সারের মতো রোগের সৃষ্টিসহ মারাত্মক বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ঢাকা শহরসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতে আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পতভাবে স্থাপিত হয়েছে ছোট-বড় অনেক শিল্প-কারখানা। এসব কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রতিনিয়ত দূষিত করছে আবাসিক এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। শিল্প-কারখানা আবাসিক এলাকা থেকে নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। ইটের ভাটা কর্তৃক নির্গত ছাই, ভাসমান বস্তুকনা নির্গমন নিয়ন্ত্রণের জন্য এগুলিকে বিজ্ঞান সম্মতভাবে আধুনিকীকরন করার পাশাপাশি মেশিনে ইট তৈরিতে উৎসাহীত করতে হবে। রাস্তার যানজটের কারণে আটকে পড়া যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া জনজীবন অতিষ্ট করে তোলে। ত্রুটিপূর্ন যানবাহনের অদগ্ধ বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে যানজট কমানোর পাশাপাশি ঢাকার চারপাশে নৌপথে চলাচল নিয়মিতভাবে চালু করা প্রয়োজন হবে। নৌপথে চলাচলের জন্য সদরঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত, অন্যদিকে আশুলিয়া বাজার থেকে টংগী হয়ে ও রামপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত করে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথে চলাচলে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে ঢাকার চারপাশে নৌপথ খনন ও পুনঃখনন করা দরকার। ফলে ঢাকা শহরের যানজট কমে আসবে একই সাথে যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। বায়ু দূষণ প্রতিরোধে ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশিষ্ট অনান্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বায়ু দূষণরোধে ও পরিবেশ সংরক্ষণে দেশের প্রত্যেক নাগরিককেই প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক।

এই সংবাদ ৫৬২ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন