কৃষিযন্ত্রে দ্বিতীয় যুগ শুরু | আলোকিত প্রতিদিন

কৃষিযন্ত্রে দ্বিতীয় যুগ শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে দ্বিতীয় যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। এ দেশের কৃষকেরা জমি চাষ, সেচ ও ফসল মাড়াইয়ে যন্ত্রের ব্যবহারে প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন শুরু হয়েছে রোপণ, ফসল কাটাসহ দ্বিতীয় পর্যায়ের যন্ত্রপাতির ব্যবহার।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে ভিন্নতা আসে। বাংলাদেশে যেহেতু মাথাপিছু আয় বাড়ছে, সেহেতু কৃষি খাতে শ্রমিকসংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে নতুন ধরনের কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। পাশাপাশি সরকারও কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের এক গবেষণা অনুযায়ী, ফসল আবাদে জমি চাষ, সেচ, নিড়ানি, কীটনাশক প্রয়োগ ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে দেশে ৬৫ থেকে ৯৫ শতাংশ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। কিন্তু রোপণ, সার দেওয়া, ফসল কাটা, শুকানো ও পণ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার একেবারেই নগণ্য। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বলছে, দেশে এখন রোপণযন্ত্র বা ট্রান্সপ্ল্যান্টার, ফসল কাটার যন্ত্র বা হারভেস্টর, মাড়াই যন্ত্র ইত্যাদির বাজার তৈরি হচ্ছে।

বিএইউর গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬–১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে কৃষিযন্ত্রের বাজার ছিল ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ আমদানি করা ও বাকিটা দেশে উৎপাদিত। কৃষিযন্ত্রের বাজারের প্রবৃদ্ধি বছরে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। কোম্পানিগুলো বলছে, সেচযন্ত্র, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার, ট্রান্সপ্ল্যান্টার, হারভেস্টর, মাড়াইযন্ত্র ইত্যাদির বড় অংশ আমদানি করা হয়। দেশে কৃষিযন্ত্র তৈরির বেশ কিছু কারখানা গড়ে উঠেছে। কৃষি যন্ত্রপাতির খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করছে দেশীয় কোম্পানিগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটা দাগে তিনটি কারণে দেশে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি: কৃষিতে শ্রমিকসংকট মোকাবিলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো আর তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করে তোলা। বিএইউর কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মঞ্জুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামীণ শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখন কৃষিকাজ করে। এ হার ২০৩০ সালে ২০ শতাংশে নামবে। ফলে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতেই হবে। তিনি বলেন, কৃষকের বয়স হয়েছে। তরুণেরা কৃষিতে আগ্রহী নয়। ৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে ৬০০ টাকা মণ দামের ধান চাষ সম্ভব নয়। ফলে যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া কৃষকের বিকল্প নেই।

মঞ্জুরুল আলম বলেন, স্বাধীনতার পরে যন্ত্রের মাধ্যমে সেচের কারণে আবাদ বেড়েছে। বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে দেশের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি চাল উৎপাদনও সম্ভব হয়েছে যান্ত্রিকীকরণের কারণে। আগামী দিনে দেশে হারভেস্টর, ট্রান্সপ্ল্যান্টারের মতো কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের কৃষি খাতে শ্রমিকসংকট বাড়ছে। শ্রমিকেরা এখন আনুষ্ঠানিক খাতের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬–১৭ অনুযায়ী, মোট শ্রমিকের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন কৃষি, বনজ ও মৎস্য খাতে নিয়োজিত। ২০০২–০৩ অর্থবছরে এ হার ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ।

শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬–১৭ অর্থবছরে দেশের কৃষি খাতে মজুরি বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ হারে। এ হার শিল্প খাতের চেয়ে বেশি। শিল্প খাতে মজুরি বেড়েছে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ হারে। অবশ্য সেবা খাতে মজুরি আরও কিছুটা বেশি হারে বেড়েছে, ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ওই বছর জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ।

নওগাঁর সদর উপজেলার হাপানিয়া ইউনিয়নের একডলা গ্রামের কৃষক মোসলেম উদ্দিন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকায় এখন একজন কৃষিশ্রমিককে মোট ৩৫০ টাকা মজুরি দিতে হয়। এটা বছর দুয়েক আগেও ২৫০ টাকা ছিল। তিনি বলেন, মৌসুমের সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। এ কারণে তখন মজুরি ৪০০ টাকায় উঠে যায়। খরচ অনেক বেশি বলে তিনি বেশির ভাগ জমি বর্গা দিয়েছেন।

কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরসের হিসাব অনুযায়ী, ১ একর জমি চাষে সনাতন পদ্ধতিতে খরচ হয় ৩ হাজার টাকা। এটা পাওয়ার টিলারে নেমে আসে ৩১০ টাকায়। আর টাক্টরে ৫৭৫ টাকা ব্যয়ে চাষ করা যায় সমপরিমাণ জমি। ফসল কাটার ক্ষেত্রে ১ একর জমিতে সনাতন পদ্ধতির খরচ ৮ হাজার ৪০০ টাকা। একই জমিতে ফসল কাটার যন্ত্র বা রিপার মেশিনে খরচ ৩৮৫ টাকা। কাটা ও মাড়াই বাবদ কম্বাইন্ড হারভেস্টরে ব্যয় ১ হাজার ১০০ টাকা।

বিএইউর কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১ হেক্টর জমিতে বীজ, জমি তৈরি, সারের দামসহ ধান রোপণে ট্র্যান্সপ্ল্যান্টার মেশিনের খরচ ১৪ হাজার ৮৮১ টাকা। সনাতন পদ্ধতির ব্যয় ২৪ হাজার ৪৪৫ টাকা।

আলোকিত প্রতিদিন/১৮ মার্চ/আরএ

এই সংবাদ ৩০৩ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন